
সেন্টমার্টিন ভ্রমণের বিস্তারিত পরিকল্পনা
সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এটি বাংলাদেশের মূলভূখন্ডের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত। কক্সবাজার জেলা শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে ১৭ বর্গ কিলোমিটারের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ। স্থানীয় ভাষায় সেন্টমার্টিনকে নারিকেল জিঞ্জিরা বলে ডাকা হয়। নীল আকাশ আর সাথে সমুদ্রের নীল জলের মিতালী, সারি সারি নারিকেল গাছ এ দ্বীপকে করেছে অনন্য। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত এ দ্বীপটি বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন স্থান যা ভ্রমণ পিয়াসী মানুষকে দুর্নিবার আকর্ষনে কাছে টেনে নেয়।
ভ্রমণ পরিকল্পনা
অনেকে সকালের শিপে গিয়ে বিকালের শিপে ব্যাক করেন। এটা আসলে এক ধরণের ভুল সিদ্ধান্ত। এতে জাহাজ থেকে উঠা নামার মাঝখানে ১ ঘন্টা সময় পাওয়া যায়। এই ১ ঘন্টা জেটি ঘাটে কেটে যায়, দ্বীপ আর দেখা হয়না কিছুই। নূন্যতম ১ রাত সেন্টমার্টিন থাকলে ভালো। তবে ২ রাত থাকলে সবকিছু ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। সেন্টমার্টিনের সবচেয়ে সুন্দর অংশ হলো সেন্টমার্টিনের পশ্চিম বিচ। পশ্চিম বিচ থেকে যতদূর চোখ যায় শুধু নীল জলরাশি। তাই পশ্চিম বিচের কোনো রিসোর্টে থাকাই ভালো। যারা ১ রাত থাকতে চান তারা প্রথমদিন বিকালেই ছেঁড়াদ্বীপ থেকে ঘুরে আসতে পারেন। ট্রলারে করে ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়া যায়।তবে চাইলে হেঁটে হেঁটে যেতে পারবেন। অথবা সাইকেল নিয়েও ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়া যায়।
সেন্টমার্টিন ট্যুর প্ল্যান ১: ডে লং ট্রিপ
যারা সময়ের অভাবে ডে লং ট্রিপে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে যাবেন তারা জাহাজ থেকে নেমে সময় নষ্ট না করে ভ্যান নিয়ে সরাসরি চলে আসুন পশ্চিম বীচ বা মেইন বীচে। এর জন্য আপনাকে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা ভ্যান ভাড়া গুণতে হবে। এখানে হেঁটে আসতে ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় লাগে তবুও ডে লং ট্রিপে সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। এই জায়গাটা পানিতে নামার জন্য ভালো তাই বীচে এসে চাইলে সচ্ছ পানিতে গা ভেজাতে পারেন। যাই করেন না কেন অবশ্যই মাথায় রাখবেন আপনাকে ২ টার আগে ফ্রি হতে হবে নইলে খাওয়ার সময়টুকুও পাবেন না। আর অবশ্যই ৩ টার আগেই আপনাকে জাহাজে পৌঁছাতে হবে। হাতে সময় থাকলে মেইন বীচের কাছে হুমায়ূন আহমেদের কটেজ দেখে আসতে পারেন। সেন্টমার্টিন ভ্রমণে এই ধরণের ট্রিপ আপনাকে সময়ের প্রতি সীমাবদ্ধ করে রাখবে তাই অন্তত এক দিনের প্ল্যান নিয়ে সেন্টমার্টিন আসুন।
সেন্টমার্টিন ট্যুর প্ল্যান ২: দুই দিন এক রাত
প্রথম দিন
সব ঠিক থাকলে দুপুর ১২ টা থেকে সাড়ে ১২ টার মধ্যেই সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছে যাবেন। সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছে আগে হোটেল বুকিং করা না থাকলে হোটেল ঠিক করে নিন। হোটেল ঠিক করে চেক ইন করে বেরিয়ে পড়ুন সেন্টমার্টিনে সমুদ্র স্নানের উদ্দেশ্যে। সমুদ্র স্নান সেরে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য রিসোর্টে আগে অর্ডার করে রাখতে পারেন অথবা আশেপাশের কোন হোটেল থেকে খাবার খেতে পারেবন। এই ক্ষেত্রে কেয়ারি মারজান রেস্তোরাঁ, বিচ পয়েন্ট, হোটেল আল্লার দান, বাজার বিচ, আসাম হোটেল, সি বিচ, সেন্টমার্টিন, কুমিল্লা রেস্টুরেন্ট, রিয়েল রেস্তোরাঁ, হাজী সেলিম পার্ক ও হোটেল সাদেক-কে বেছে নিতে পারেন।
বিকেল বেলা পশ্চিম বিচে সময় কাটাতে পারেন অথবা হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকলে জেটি ঘাট থেকে ট্রলার/স্পিড বোটে চলে যান ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণে। যদি ছেঁড়া দ্বীপ যান তাহলে দ্বীপে সূর্যাস্থ দেখে হোটেলে সন্ধ্যার ফিরে আসুন। রাতে বারবিকিউ করতে চাইলে উপরে উল্লেখিত যেকোন খাবার হোটেল কিংবা আপনার হোটেল বা রিসোর্টের সাথে বললে তারাই ব্যবস্থা করে দিবে। এক্ষেত্রে নিজেরা মাছ বাচাই করে কিনে দেওয়ার চেষ্টা করবেন এবং প্রয়োজনে দামাদামি করে নিবেন।
দ্বিতীয় দিন
পরদিন ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে সাইকেল ভাড়া নিয়ে অথবা পায়ে হেটে সেন্টমার্টিন দ্বীপ ঘুরে দেখতে পারেন। পায়ে হেটে দ্বীপ ঘুরতে বের হলে অবশ্যই সাথে খাবার পানি নিয়ে নিবেন। চাইলে পুরো দ্বীপই ঘুরে দেখতে পারেন। ৩-৪ ঘন্টা সময় নিয়ে দ্বীপের চারপাশ ঘুরে দেখতে ভালই লাগবে। আর আগের দিন যদি ছেঁড়া দ্বীপ না গিয়ে থাকেন তাহলে সকালের সময়টা ছেঁড়া দ্বীপে কাটিয়ে আসুন। দুপুরের আগেই বিদায়ী সমুদ্র স্নান ও খাওয়া দাওয়া সেরে ৩ টার মধ্যে টেকনাফের জাহাজে চড়ে বসুন। সেন্টমার্টিন জেটি ঘাট থেকে জাহাজগুলো ঠিক বিকাল ৩ টায় ছেড়ে যায়। তাই সময়ের আগে জেটি ঘাটে উপস্থিত না হতে পারলে জাহাজ মিস হবার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এমন ক্ষেত্রে হয় আপনাকে সেদিন দ্বীপে থাকতে হবে অথবা ট্রলারে করে ফিরতে হবে, যা অনেকটা বিপদজনক।
সেন্টমার্টিন ট্যুর প্ল্যান ৩: তিন দিন দুই রাত
প্রথম দিন
সব ঠিক থাকলে দুপুর ১২ টা থেকে সাড়ে ১২ টার মধ্যেই সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছে যাবেন। সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছে হোটেল ঠিক করে দুপুরের খাবার খেয়ে আলস্য মেখে বিশ্রাম নিয়ে বিকেল বেলা আড্ডায় কাটিয়ে দিন। এই সময়টা পশ্চিম বিচে হেঁটে হেঁটে গল্প গুজব করে কাটিয়ে দিতে পারেন। রাতের বেলায় রিসোর্টে বলে অথবা হোটেল থেকে ফিশ বারবিকিউ এর আয়োজন করে নিতে পারেন।
দ্বিতীয় দিন
দ্বিতীয় দিন সকালে অথবা বিকেলের সময়টা ঠিক করে রাখুন ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণের জন্যে। তবে ছেঁড়া দ্বীপে বিকেলে গেলেই সবচেয়ে ভাল লাগবে। সেই ক্ষেত্রের সকালের সময়টা দ্বীপে হেঁটে চারপাশ ঘুরে অথবা সাইকেল ভাড়া করে ঘুরে দেখতে পারেন। হেঁটে হেঁটে দ্বীপ ঘুরে দেখতে ৩-৪ ঘন্টা লাগবে। দুপুরে সমুদ্রে গোসল করে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে চলে যান জাহাজ ঘাটে। সেখান থেকে ট্রলার বা বোটে করে যাবেন ছেঁড়া দ্বীপে। ছেঁড়া দ্বীপে বিকেল সময়টা কাটিয়ে সুর্যাস্ত দেখতে দেখতে ফিরে আসুন। যদি কেনাকাটা করতে চান তাহলে সন্ধ্যার সময়টা সেন্টমার্টিন বাজারে কাটিয়ে ফিরে আসুন নিজের রিসোর্টে। রাতে ক্যাম্পিং কিংবা বারবিকিউ এর আয়োজন করে ফেলুন। সাগর পাড়ের এই রাত আড্ডা আপনার মনকে আজীবন তৃপ্ত করবে।
তৃতীয় দিন
সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে বিদায়ী সমুদ্র স্নানের পর ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকুন। ৩ টার আগে জাহাজে চড়ে বসুন। সেন্টমার্টিন দ্বীপের জাহাজ জেটি এবং টেকনাফ থেকে সরাসরি ঢাকায় আসার বিভিন্ন বাস পাওয়া যায়। আপনার পছন্দের বাসে বাড়ির পথে রওনা দিয়ে দিন। অথবা যদি কক্সবাজার যেতে চান তাহলে টেকনাফ থেকে বাসে বা সিএনজতে কক্সবাজার চলে যেতে পারবেন।
সেন্টমার্টিন ভ্রমণ খরচ:
যাতায়াত খরচ: বাসের টিকেট – যাওয়া ও আসা সহ ১,৮০০ টাকা (নন এসি), ৩,১০০-৩,৪০০ টাকা (এসি)। শিপ/জাহাজ ভাড়া – যাওয়া ও আসা সহ ৬০০-৮০০ টাকা (ওপেন ডেক), ১০০০-১৬০০ টাকা (এসি)। ছেড়া দ্বীপ – ট্রলারে যাওয়া আসা ২০০ টাকা। লোকাল যাতায়াত – সেন্টমার্টিনের বাজারে কিংবা আশেপাশে যাওয়ার ভ্যান ভাড়া ১৫০-২০০ টাকা। অন্যান্য খরচ – ২০০টাকা।
খাবার খরচ: যাত্রার দিন –খাবার ১০০-২০০ টাকা। ১ম দিন – নাস্তা ৬০-১০০ টাকা, দুপুরের খাবার ১২০-২২০ টাকা ও রাতের খাবার/বার বি কিউ ২০০-৩০০ টাকা। ২য় দিন – নাস্তা ৬০-১০০ টাকা, দুপুরের খাবার ১২০-২২০ টাকা। ফিরে আসার দিন – খাবার ১০০-২০০ টাকা। চাইলে আরও কম খরচে খাওয়া দাওয়া করা সম্ভব। বাজারের ভিতরের দিকে হোটেল গুলোতে গিয়ে সাধারণ খাবার খেলে খরচ অনেক কমে যাবে।
থাকার খরচ: স্ট্যান্ডার্ড হোটেল/রিসোর্ট ডাবল বেড ১২০০-২০০০ টাকা। বাজারের দিকে মোটামুটি মানের হোটেল ৮০০-১২০০ টাকা। খুবই পিক সিজন আর সরকারি ছুটির দিনে ভাড়া আরও একটু বেড়ে যাবে। এই ক্ষেত্রে সমুদ্রের কাছের বা একটু ভালো রিসোর্ট থাকতে রুম প্রতি ২০০০-২৫০০ টাকা লাগবে। বেশিরভাগ রুমে ডাবল বেড থাকে। এক রুমে কয়েকজন মিলে থাকলে খরচ ভাগ হয়ে কমে যাবে। পিক সিজন ও ছুটির দিন ছাড়া গেলে খরচ আরও কম হবে।
সেন্টমার্টিন ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা
যেকোন সমস্যায় টুরিস্ট পুলিশের সহযোগিতা নিন। হটলাইন +০৮৮০১৭ ৬৯৬৯ ০৭৪০
সেন্টমার্টিন আমাদের দেশের সম্পদ, তাই প্রকৃতির ক্ষতি হয়ে এমন কিছু করবেন না।
সঠিক জায়গায় ময়লা আবর্জনা ফেলবেন। দয়া করে প্লাস্টিক/পলিথিন কিছু সৈকতে ফেলে আসবেন না।
কম খরচে সেন্টমার্টিন থাকা ও খাওয়ার জন্যে ছুটির দিন গুলোতে না গিয়ে অন্যান্য দিনে যেতে পারেন।
পর্যটন এলাকায় যে কোন কিছুর জন্যে দরদাম করবেন কেনাকাটায়।
মানুষ বেশি হলে আগেই শিপের টিকেট কেটে রাখতে পারেন।
চাইলে কক্সবাজার বিভিন্ন এজেণ্ট থেকে সেন্টমার্টিন এর প্যাকেজ কিনে নিতে পারবেন।
সেন্ট মার্টিন যাওয়া আসার সময় জাহাজের ডেক থেকেই সবচেয়ে সুন্দর ভিউ দেখতে পাবেন।
সমুদ্রে নামার সময় সতর্ক থাকুন।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়, তাই আমাদের প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়েছে। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো।
.png)
