

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত (Cox’s Bazar Sea Beach), বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পর্যটন কেন্দ্র যা কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত। বিশ্বের সব থেকে বড় সমুদ্র সৈকতের জন্যে এটি সারা বিশ্বের কাছে সমাদৃত যা কক্সবাজার শহর থেকে বদরমোকাম পর্যন্ত একটানা ১২০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। সারি সারি ঝাউবন, পাহাড়, ঝর্ণা, বালুর নরম বিছানা এবং বিশাল সমুদ্র সৈকত। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি আর শোঁ শোঁ গর্জনের মনোমুগ্ধকর সমুদ্র সৈকতের আরেক নাম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এর দর্শনীয় স্থান:
কক্সাবাজারের তিনটি সৈকত মোটামটি বিখ্যাত। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের যেসব জায়গায় পর্যটকদের আনাগোণা সবচেয়ে বেশি থাকে তার মধ্যে লাবনী, সুগন্ধা ও কলাতলী সী বিচ পয়েন্ট অন্যতম।
লাবণী বিচ পয়েন্ট/সৈকত
বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকত বললে প্রথমেই চোখে ভেসে ওঠে কক্সবাজারের কলাতলীতে অবস্থিত কক্সবাজার পুরাতন সি-বিচ যা লাবণী পয়েন্ট বা পুরাতন সি-বিচ হিসেবেও পরিচিত। কক্সবাজারে লাবনী সৈকতের জনপ্রিয়তা অনেক উপরে। অনেকে কক্সবাজারের সবচেয়ে সুন্দর সৈকত বলেন এটিকে। থাকা-খাওয়া, যানবাহন থেকে শুরু করে প্রায় সবই এখানে হাতের কাছে পাবেন। অর্থাৎ যে কোনো মানের সার্বিক ব্যবস্থা এখানে রয়েছে। নিকটেই শত শত ছোট দোকান পাবেন। সেখানে ঝিনুকের তৈরি উপহার সামগ্রী ও অলংকার বিক্রি হয়। এছাড়াও পাওয়া যায় সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণ সহযোগী উপকরণ যেমন হাফ, থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, হ্যাট, ক্যাপ, ছাতা, চশমা ইত্যাদি। এই সৈকতে সার্ফিং করা ও বীচ বাইক চালানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
সুগন্ধা বিচ পয়েন্ট/সৈকত
সুগন্ধা বিচ কক্সবাজারের আরেকটি পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্র। এটা কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টে অবস্থিত। সমুদ্র স্নানের প্রকৃত স্বাদ নিতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক সুগন্ধা সৈকত ভ্রমণ করে। সমুদ্রস্নানের পাশাপাশি স্কি-বোটে করে ভেসে বেড়ানোর ইচ্ছাটিও পূরণ করা যায় এখানে। রাস্তার দু’পাশে সামুদ্রিক তাজা মাছের হরেক পদ পরখ করে দেখার শখ কিন্তু অনেকেরই থাকে। এখানে সেই শখ মিটবে আপনার। এই সৈকতে চাঁদের আলোয় হাঁটার চমৎকার পরিবেশ রয়েছে। বিশেষ করে চাঁদনি রাতে বিচে হাঁটা সত্যিই রোমঞ্চকর সকল বয়সী মানুষের জন্যই। সকাল এবং সন্ধ্যাতে এখানে উপভোগের জন্য রয়েছে নানা ধরনের শুকনো মাছ, খাবার ইত্যাদি। এই সৈকতে সার্ফিং করা ও বীচ বাইক চালানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
কলাতলী বিচ পয়েন্ট/সৈকত
কলাতলী বিচ কক্সবাজারের আরেকটি পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্র। এটা কক্সবাজারের কলাতলী পয়েন্টে অবস্থিত। বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন মানুষ এখানে ভ্রমণ করতে আসেন, সমুদ্রে গোসল করতে আসেন, আসেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কলাতলী বিচে নানা ধরনের খাবারের রেস্টুরেন্টসহ আরো অনেক পর্যটন সুবিধা রয়েছে। বিশেষ করে চাঁদনি রাতে বিচে হাঁটা সত্যিই রোমঞ্চকর সকল বয়সী মানুষের জন্যই। সকাল এবং সন্ধ্যাতে এখানে উপভোগের জন্য রয়েছে নানা ধরনের শুকনো মাছ, খাবার ইত্যাদি।কলাতলী সৈকতে আছে বেশকিছু রেস্টুরেন্ট, যেখানে বসে এক মগ কফি পান করতে করতে মনোরম সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়।
হিমছড়ি সৈকত
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত হিমছড়ি পর্যটন কেন্দ্র। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এ সমুদ্র সৈকতের নাম হিমছড়ি। এখানকার সমুদ্র সৈকতটি কক্সবাজারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত নির্জন ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। এর সৌন্দর্যও কোনো অংশে কম নয়। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হিমছড়ি যত না সুন্দর তার চাইতে সুন্দর ও রোমাঞ্চকর হল কক্সবাজার থেকে এ সৈকতে যাওয়ার পথটি। একপাশে বিস্তৃর্ণ সমুদ্রের বালুকা বেলা আর এক পাশে সবুজ পাহাড়ের সাড়ি। মাঝে পিচ ঢালা মেরিন ড্র্রাইভ। এমন দৃশ্য সম্ভবত দেশের আর কোথাও পাওয়া যাবে না। কেউ কক্সবাজার এলো অথচ এই পথ ধরে ছুটলো না তার পুরো ভ্রমনই মাটি। এখানে পাহাড় চূড়ায় একটি রিসোর্টও রয়েছে, যেখান থেকে নীল জলরাশির বিশাল সমুদ্রকে সহজেই দেখা যায়।হিমছড়িতে একটি ছোট পর্যটন কেন্দ্র আছে। টিকেট কেটে এখানে ঢুকতে হয়। ভীতরের পরিবেশটা বেশ সুন্দর। পাহাড়ের উপরে আছে অনেকগুলো বিশ্রামাগার। প্রায় ২ শতাধিক সিড়ি মাড়িয়ে উপরে উঠতে হয়। কষ্টটা মুহুর্তেই ভুলে যাবেন যখনপাহাড়ের চুড়া থেকে কক্সবাজারের পুরো সমুদ্র সৈকতটা এক পলকে দেখতে পাবেন। দুলর্ভ সে দৃশ্য। এছাড়াও হিমছড়িতে একটি মিঠা পানির জলপ্রপাত রয়েছে যা বর্ষার সময় পানি থাকলেও অন্যান্য সময় থাকে শুষ্ক। তবুও প্রাকৃতিক পরিবেশ হিসেবে হিমছড়ি পর্যটকদের কাছে অনন্য এক আকর্ষণ।
দরিয়া নগর
পাহাড়, সমুদ্র আর সুর্যের মিলনের এ অপরূপ দৃশ্য বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের নিকটবর্তী দরিয়ানগর পর্যটন ।প্রকৃতির এ অপরূপ সমন্বয় অবলোকনের জন্য যেতে হবে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে কলাতলী মোড় থেকে মাত্র আট কিলোমিটার পূর্বদিকে। একদিকে দৃষ্টি জুড়ে বঙ্গোপসাগর আর অন্য দিকে পাহাড় এরই মাঝখান দিয়ে কক্সবাজার হতে টেকনাফগামী রাস্তা। এই রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেই সবুজে ঘেরা বড়ছেড়া গ্রাম। এই গ্রামের ৫৩ হেক্টর জমির ওপরে উঁচু-নিচু পাঁচটি পাহাড়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই বিনোদন কেন্দ্রটি। দরিয়ানগর বিনোদন কেন্দ্র। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে সুন্দর মনোরম পরিবেশে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটু নিরবিলিতে সমুদ্র দেখতে চাইলে দরিয়ানগর সমুদ্র সৈকত হতে পারে আদর্শ জায়গা।
বর্তমানে দরিয়া নগরে সবচেয়ে বড় আকর্ষন প্যারাসেইলিং। কক্সবাজার বেড়াতে আসা পর্যটকদের আনন্দ আরো বাড়িয়ে দিতে শুধুমাত্র দরিয়ানগর সৈকতেই রয়েছে প্যারাসেইলিং করার ব্যবস্থা। বর্তমানে দরিয়ানগরে দুইটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্যারাসেইলিং করা যায়। স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টস প্রতিষ্ঠানটির তিনটি প্যাকেজ আছে, এই প্যাকেজগুলো নিতে আপনাকে যথাক্রমে ১৫০০, ২০০০ ও ২৫০০ টাকা খরচ করতে হবে। আর ফানফেস্ট বীচ এক্টিভিটিজ নামের প্রতিষ্ঠানটির দুইটি প্যাকেজ রয়েছে। যেগুলো ১৫০০ ও ২০০০ টাকায় নেওয়া যায়। মোবাইল: 01730-633757, 01755-596996, 01762-592892। ফেইসবুক লিংকঃ www.facebook.com/funfestbd । জেনে রাখা ভালো, ১৫০০ টাকার রাইডে শুধু আকাশে উড়ায়। আর ২০০০ টাকার রাইডে আকাশে উড়ানোর পর নিচে সমুদ্রের পানিতে পা স্পর্শ করিয়ে আবার আকাশে উড়ানো হয়। সকল ক্ষেত্রেই ৫ থেকে ১২ মিনিট সময় পর্যন্ত ৩০০ থেকে ৪৫০ ফুট পর্যন্ত ওপরে উঠানো হয়।
ইনানী সৈকত
কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ১২০ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকতের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, আকর্ষণীয় ও নয়নাভিরাম হচ্ছে ইনানী সমুদ্র সৈকত বা ইনানী বীচ (Inani Beach)। ভাটার সময় ইনানী সমুদ্র সৈকতে সেন্টমার্টিনের মত প্রবাল পাথরের দেখা মিলে। এখানে কক্সবাজারের মত সাগর এত উত্তাল থাকে না আর এই শান্ত সাগরই পর্যটকদের আরো বেশী বিমোহিত করে।এছাড়া টেকনাফ গামী মেরিন ড্রাইভ রোড দিয়ে ইনানী বীচে যাবার সময় হিমছড়ির পাহাড়, সমুদ্র তীরের সাম্পান, নারিকেল ও ঝাউবন গাছের সারি আর চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে আপনার ভ্রমণের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে মন প্রফুল্ল হয়ে উঠবে।ইনানী বীচ কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দক্ষিণে ও হিমছড়ি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানকার প্রধান আকর্ষণ জীবন্ত প্রবল। অনেকটাই পাথরের মতো দেখতে এই প্রবল গুলো খুবই সুন্দর। কক্সবাজারের মতো এখানে বড় বড় ঢেউ নেই। ছোট ছোট ঢেউ এসে আছড়ে পরে পাথরের উপর। পানির উপর ভাসমান এইসব পাথরের উপর দাঁড়িয়ে পা ভেজাতে দারুন মজা।জোয়ারের সময় এলে প্রবাল পাথরের দেখা পাওয়া যাবে না। ভাটার সময়েই কেবল মাত্র বিশাল এলাকা জুড়ে ভেসে উঠে এই পাথর। প্রবাল পাথরে লেগে থাকে ধারালো শামুক-ঝিনুক। তাই এখানে বেশী লাফালাফি করা বিপদজনক।
ইনানী সৈকতের প্রধান আকর্ষণ প্রবাল পাথর। প্রায় প্রতিটা পাথরই নানা আকার আর ধরণের। কত বছরের পুরনো সে পাথর! আর তাতে মিশে আছে কত স্মৃতি! আপনি যদি টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ দিয়ে ইনানী সৈকতে যান তবে যাবার পথে আপনার দু চোখ জুড়িয়ে দেবে উঁচু উঁচু পাহাড় আর উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ। শুধু চোখই জুড়বে না, বরং পুরো সময়টা আপনি থাকবেন এক ধরণের সিদ্ধান্তহীনতায়! এক পাশে পাহাড় আরেক পাশে সাগর। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবেন? মন যে দু দিকই দেখতে চাইবে।
মেরিন ড্রাইভ রোড
বর্তমানে কক্সবাজার ভ্রমনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ রোড (Marine Drive Road)। বঙ্গোপসাগর এর পাশ দিয়ে কক্সবাজারের কলাতলী সৈকত থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটিই কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ (Marine Drive)। মেরিন ড্রাইভ রোডের এক দিকে রয়েছে উত্তাল সমুদ্র সৈকত আর অন্য দিকে রয়েছে সবুজের ঢাকা ছোট-বড় পাহাড়। আবার কোথাও কোথাও পাহাড়ের গা বেয়ে ঝর্ণা ধারার দেখা বিশাল বিস্তৃত সৈকত, ইনানী পাথুরে সৈকত ও জেলেদের সাগরে মাছ ধরা উপভোগ করা যায় মেরিন ড্রাইভ রোড দিয়ে যেতে যেতে।
কক্সবাজারের কলাতলী বা সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে মেরিন ড্রাইভ রোড যাবার জন্য খোলা জীপ, মাইক্রোবাস, সিএনজি, অটো ইত্যাদি পাওয়া যায়। পছন্দ মতো দরদাম করে ভাড়া করে নিবেন। সিএনজি কিংবা অটোরিক্সাতে করে মেরিন ড্রাইভ রোড ঘুরে আসতে অনেক বেশি সময় লাগবে। দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসার জন্য খোলা জীপ নিলে ভালো। সিজনের উপর গাড়ি ভাড়া নির্ভর করে। সাধারণত খোলা জীপ ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা নিবে। সম্পূর্ন মেরিন ড্রাইভ ঘুরে আসতে প্রায় ৫ ঘন্টার মত সময় লাগবে। কোন পর্যন্ত যাবেন গাড়ি ঠিক করার সময় ড্রাইভারকে সেটা বলে নিবেন। তা না হলে হয়তো আশেপাশের একটু জায়গা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারে।
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ও সেরা পর্যটন নগরী কক্সবাজারশহর থেকে ৩১ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত পাটুয়ারটেক পাথর রাণী । কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ার টেকে প্রাকৃতিক সুন্দর্যে সৌন্দর্যে ভরপুর পাথরের রানী সী-বীচ। কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে হিমছড়ি হয়ে ইনানী সী-বীচের থেকে আরও সামনে গেলে নজরে পড়ে পাটুয়ার টেক পাথরের রানী সী-বীচ। প্রধান সড়কের কাছে এ সমুদ্র সৈকত প্রবালে সয়লাভ। সৈকতে নামার তেমন কোন ব্যবস্থা না থাকলে মাঝে মধ্যে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ওই সৈকতে যান। সৈকতটি কলাতলী, সুগন্ধি, ইনানী বীচ থেকে দূরে হওয়ায় তা অবহেলায় পড়ে আছে। প্রাকৃতিকভাবে এ সৈকতে শুধু পাথর আর পাথর সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশে রয়েছে পাহাড় ঘেরা ৩০০ বছরের পুরনো কানা রাজার গুহ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
মেরিন ড্রাইভ সড়কের একপাশে পাথুরে গাথা বিশাল সমুদ্র আর অন্য পাশে বলয়জুড়ে পাহাড়ের বিস্তৃতি। পাটুয়ারটেক সমুদ্র সৈকত আর রাতে সেখানকার বালিতে আছড়ে পড়া ঢেউ দেখলে মনে হবে যেন ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রত্ন। বর্ষায় পাহাড় অরণ্যের এ রুপ সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় থাকে। বাতাসে অধিক পরিমাণে জলীয়বাস্প জমলে, তার সাথে ব্যাকটেরিয়ার বিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় উজ্জ্বল আলোর। প্রকৃতিতে রাতে নির্জন সৈকত ও গভীর অরণ্যে এনে দেয় আলো ঝলমলে উজ্জ্বলতা। বিশাল আকাশের নিচে এক অপরুপ লীলাভূমি উখিয়ার পাটুয়ারটেক পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সবুজ পাহাড় বেষ্টিত পাথুরে গাথা সমুদ্রে পথে পথে দেখা মিলে সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। গভীর সমুদ্রে জেলেদের ব্যস্ততা, সাগর থেকে মাছ নিয়ে ফেরে জেলেরা। কেউ জাল বুনে অবসরে, কেউ আবার উত্তাল সাগরে নৌকা ভিড়ায়।
শামলাপুর সমুদ্র সৈকত দেখতে হলে টেকনাফের কাছে বাহারছড়া ইউনিয়নে যেতে হবে। সবুজ ঝাউবন, মাছ ধরার নৌকা এবং জেলেদের ব্যস্ততা ছাড়া তেমন মানুষজনের এখানে দেখা মিলে না। আর এই নির্জনতাই ভ্রমণপ্রিয় মানুষকে শামলাপুর সমুদ্র সৈকতের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। দৃষ্টিনন্দন এই সমুদ্র সৈকতটি বাহারছড়া সমুদ্র সৈকত নামেও পরিচিত। এখানকার দৃষ্টি নন্দন ঝাউবনে ঘেরা অপরূপে শোভিত নির্জন সৈকতে এসে ভালো লাগার ১৬ আনাই পাবেন!
এখানে নির্জনতাও একটা বড় ব্যাপার। কক্সবাজার, হিমছড়ি বা ইনানীতে কত মানুষের ভীড়। আর হৈহুল্লোড়। এখানে তার কিছুই নেই। কক্সবাজার, ইনানি কিংবা সেন্টমার্টিনের মত জনমানুষ পূর্ণ না হলেও নীল জলরাশি, সূর্যাস্থ, জেলেদের মাছ ধরার কর্মতৎপরতা, স্থানীয় শিশু ও মানুষের বৈচিত্রময় জীবন আপনাকে নাগরিক জীবনের অস্থিরতা থেকে ভুলিয়ে রাখবে। পড়ন্ত বেলায় মাছ ধরার ট্রলারগুলো টেনে তীরে তোলার দৃশ্য, জেলেদের জাল দিয়ে মাছ ধরা, স্থানীয় শিশুদের চিৎকার আর দৌড়ঝাঁপের মধ্যে চোখে পড়বে শুধুই সমুদ্র আর তার নীল জলরাশির শোঁ শোঁ গর্জন।।
টেকনাফ সমুদ্র সৈকত দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর সৈকত গুলোর একটি। নির্জনে যারা অবকাশ যাপন পছন্দ করেন, তাদের জন্য আদর্শ ভ্রমণ গন্তব্য এটি।খুবই পরিচ্ছন্ন এই বালুকাবেলায় পর্যটকের আনাগোনা সবময়ই কম থাকে। যারা নির্জনে সমুদ্র উপভোগ করতে চান তাদের জন্য টেকনাফ আদর্শ জায়গা।কক্সবাজার সদর থেকে টেকনাফের দূরত্ব প্রায় ৮৬ কিলোমিটার। টেকনাফ শহর ছাড়িয়ে দক্ষিণে আরো প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে এখানকার সৈকত। দেশের অন্যান্য সৈকতগুলো থেকে একেবারেই আলাদা এ সৈকত।বিশেষ করে খুব সকাল কিংবা সন্ধ্যায় জেলেদের বেশি মাছ ধরতে দেখা যায় এ সৈকতে। সৈকতের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় সারিবদ্ধভাবে জেলেদের মাছ ধরার বর্ণিল সব ইঞ্জিন নৌকা। লাল, নীল, বেগুনি ইত্যাদি বাহারি রংয়ের পতাকা দিয়ে জেলেরা এখানে তাদের নৌকাগুলোতে সাজিয়ে থাকেন। নৌকাগুলোর গায়েও থাকে রংতুলির শৈল্পিক আঁচড়। এত রঙিন বাহারি জেলে নৌকা বাংলাদেশের আর কোনো সাগর পাড়ে দেখা যায় না।
এছাড়া এ সৈকতে পাশে একটু দূরে দূরেই আছে ঘন ঝাউবন। পূর্ণিমার জোয়ারের ঢেউ টেকনাফ সৈকতে বিশাল আকার ধারণ করে। এসময় সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ এসে একেবারে তীরে আছড়ে পড়ে। টেকনাফ সমুদ্রের পাড়েমূল প্রবেশ পথ থেকে হাতের বাঁ দিকে চলে গেলে যাওয়া যায় শাহ পরীর দ্বীপের কাছাকাছি। আর হাতের ডান দিকে চলে গেলে যাওয়া যাবে হাজামপাড়া, শিলখালী কিংবা শামলাপুর সৈকতের দিকে। এখান থেকে উত্তর দিকে সৈকতের পাশ দিয়ে আকাশ ছুঁয়েছে তৈঙ্গা পাহাড়। সাগর আর পাহাড়ের নিবিড় বন্ধুত্ব দেখা যাবে এখানে। তাছাড়া এত সুন্দর, এত সাজানো বেলাভূমি দেশের অন্য কোন সৈকতে কমই দেখা যায়। টেকনাফ সৈকতের আরেক আকর্ষণ সকাল-বিকাল জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য উপভোগ করা। চিংড়ির পোনা শিকারীরা এ সৈকতে নিজস্ব কৌশলে সর্বদা ব্যস্ত থাকেন পোনা ধরতে। আর দূর সমুদ্র থেকে নৌকা বোঝাই মাছ নিয়ে শত শত জেলে এখানেই নিয়ে আসেন সকাল-বিকাল।
কক্সবাজারে পর্যটন মৌসুমে শ দুয়েক বিচ ফটোগ্রাফার পর্যটকদের ছবি তুলে থাকে। প্রায় ঘন্টা খানেকের মধ্যেই এসব ছবি প্রিন্ট করে নেগেটিভসহ পর্যটকদের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা রয়েছে। লাল পোশাক পরা এসব বিচ ফটোগ্রাফারদের প্রত্যেকের রয়েছে একটি করে আইডি কার্ড। তবে ফটোগ্রাফি করার আগে অবশ্যই দামাদামি করে নিবেন। আর ১ টা ছবির কথা বলে ওরা একই জায়গার ৮/১০ ছবি তুলে ফেলবে আর টাকা দাবি করবে। তাই সাবধান ভাড়াটা ফটোগ্রাফার থেকে।।
বিচে বেশ কয়েকটি স্পিডবোট চলে। মেইন বিচ থেকে এগুলো চলাচল করে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত। ভাড়া এক রাউন্ড ১০০টাকা। এছাড়া খোলা স্পিডবোটের সাহায্যে চলে লাইফ বোট জনপ্রতি ভাড়া ২৫০ টাকা।
তিন চাকার বেশ কয়েকটি বিচে চলার উপযোগী বাইক কক্সবাজার সাগর সৈকতে চলাচল করে। প্রায় ১ কিলোমিটার দূরত্বে এসব বাইক রাউন্ড প্রতি পঞ্চাশ টাকা করে পর্যটকদের প্রদান করতে হয়।
প্যারাসেইলিং নামের অ্যাডভেঞ্চারে করে পর্যটক আকাশ থেকে দেখতে পারেন সমুদ্র ও পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য। তিনটি প্যাকেজ আছে এখানে। ১৫শ টাকার নরমাল রাইডে রয়েছে শুধুই ওড়া। ২ হাজার টাকার সুপার রাইডে উড়তে উড়তে একবার সাগরের মধ্যে পা ভিজিয়ে ফের উপরে ওড়ার সুযোগ। ২৫শ টাকার সুপার-ডুপার রাইডে পা ভেজানো হয় দুবার।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত হচ্ছে স্নান করার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ অঞ্চল। শার্কমুক্ত পানিতে স্নান এবং রৌদ্রস্নানসহ সাঁতারের সুযোগ- সুবিধাগুলি পর্যটকদের নিকট ভ্রমণের জন্য আকর্ষেনের মূল কেন্দ্রবিন্দু।আপনি যদি ফেনাযুক্ত বিশাল ঢেউয়ে সাঁতার কাটতে চান তবে এটি আপনার জন্য সঠিক জায়গা। আপনি যতদূর কাছেই সম্ভব এই সমুদ্রঢেউ অনুভব করতে পারবেন।
অবসর সময় কাটানোর জন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত একটি চমৎকার সৈকত। বিশেষত সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় বালুকাময় সমুদ্র সৈকত এর একটি বিশেষত্ব ফুটে উঠে। যখন সূর্যো পূর্ব দিক থেকে উদিত হয় তখন মনে হয় রক্তিম গোলাকার পৃথিবী যেন সমুদ্র ভিতর থেকে ভেসে উঠছে। সূর্যাস্ত দেখা একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে। হতে পারে এই গ্রহের অন্যতম অভিজ্ঞতা।
প্রতিটি মুহূর্ত প্রতিটি দিন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত রুপের পরিবর্তন ঘটে। যদি রাতের দৃশ্যটি ভিন্ন চেহারা হয়, তাহলে বিকালে অন্য আরেক রুপে দেখা যায়।এটি যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক বিস্ময়কর নমুনা। চাঁদনি রাত্রে; চাঁদের আনন্দময় এবং নরম আলো তার সৌন্দর্য এবং চৌম্বকীয় শক্তি দিয়ে আপনাকে আলিঙ্গন করবে। তারাময় রাত এবং মাছ ধরার নৌকার আলো আকাশে একটি অপার্থিব আবহ তৈরি করে।
অনেক ভ্রমণকারীর জন্য সমুদ্র সৈকত সৌন্দর্য উপভোগ সবচেয়ে আরামদায়ক মুহূর্ত । বসে বসে তা উপভোগ করতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এ বসার জন্য অনেক আরামদায়ক বিচ লাউঞ্জ চেয়ার রয়েছে।সৈকতে আপনার চেয়ার নিতে ভুলবেন না! কিছুক্ষণের জন্য চেয়ারের ছাতার নিচে বসে এবং সমুদ্রের বিশালতা দেখতে দেখতে আপনি অতীতের মাঝে হারিয়ে যেতে পারবেন।
এই আরোহণ-অভিজ্ঞতা ছাড়াও, আপনি ঘোড়ায় রাজকীয় অশ্বারোহণ উপভোগ করতে পারবেন। আপনি ঘোড়ায় চড়া, শিখা বা অন্যন্য ভ্রমণকারীদের মতো ছবিও তুলতে পারবেন।ঘোড়দৌড় একটি কৌশল, একটি নতুন পরীক্ষা। আপনি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এর ভিড়ের মধ্যে বা সৈকতের কাছাকাছি ঘোড়ায় ঘুরতে পারেন। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এর ফাঁকা অংশে শেখা অথবা আরোহণের উদ্দেশ্যে একাকিত্বভাবে ঘোড়ায় চড়তে পারবেন।এটি ১০০ টাকা মূল্যে প্রতি ঘন্টায় ভাড়া করা যায়।
সমুদ্র সৈকত মানেই সমুদ্রের ঢেউ! বীচ বাইকে চড়া অথবা প্যারাসেইলিং উড়ার মতো সমুদ্র পৃষ্ঠের উপর বিচ বোটও চালাতে পারবেন।এটি যেকোন পর্যটকদের জন্য আরেক অভিজ্ঞতা যা সমুদ্র বিচ বাইক এর বিপরীত। কিন্তু চালানো একই – একটি বালির উপর এবং অন্যটি জলের উপর।আপনি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ভ্রমণের সময় এই সুযোগটি নিতে পারেন। প্রতি রাউন্ডে ২০০-৩০০ টাকায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য এটি একটি ভাল মূল্য!
কক্সবাজার হচ্ছে সুস্বাদু খাবারের বিশাল উৎস। যেখানে সামুদ্রিক মাছ অনেক রেসিপি মাধ্যমে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে পরিবেশিত হয়। তরতাজার জন্য সামুদ্রিক মাছের অনেক ভাল স্বাস্থ্যগত বিষয় জড়িয়ে আছে।সাধারণত, এই মাছগুলি তাজা অবস্থায় রান্না করা হয়।মাছভোজনকারীরা সীফুড এবং মিষ্টি-পানির মাছের স্বাদ এড়িয়ে চলতে পারে না। টাটকা ভেটকি, ধূমায়িত ইলিশ, লবস্টার, ফনস, মালাইকারী এবং চিংড়ির দোপেয়াজা কেবল স্বাদ এর জন্য নয় – এই খাবারগুলো স্বাস্থ্যের জন্যও অনেক ভাল।
সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও অন্যান্য তথ্য
সমুদ্রে নামার আগে অবশ্যই জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিন। এ সম্পর্কিত ইয়াছির লাইফ গার্ডের বেশ কয়েকটি সাইনবোর্ড ও পতাকা রয়েছে বিচের বিভিন্ন স্থানে। জোয়ারের সময় সমুদ্রে গোসলে নামা নিরাপদ। এ সময় তাই জোয়ারের সময় নির্দেশিত থাকে, পাশাপাশি সবুজ পতাকা ওড়ানো হয়। ভাটার সময়ে সমুদ্রে স্নান বিপজ্জনক ভাটার টানে মুহূর্তেই হারিয়ে যেতে পারে যে কেউ। তাই এ সময় বিচ এলাকায় ভাটার সময় লেখাসহ লাল পতাকা ওড়ানো থাকলে সমুদ্রে নামা থেকে বিরত থাকুন। কোনোভাবেই দূরে যাবেন না। প্রয়োজেন পর্যটকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ইয়াছির লাইফ গার্ডের সহায়তা নিন। ওদের জানিয়ে বিচে নামুন।
শুধুমাত্র একটু সতর্কতার অভাবে প্রতি বছর অনেক পর্যটক সমুদ্রের পানিতে গোসল করতে গিয়ে প্রানহানির শিকার হচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে সবাইকে বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে। সৈকতের লাবনী পয়েন্ট থেকে কলাতলী বিচ পর্যন্ত গুপ্ত খাল রয়েছে এবং বেশীর ভাগ পর্যটক ভাটার সময় নেমে এই গুপ্ত খালে পরে প্রান হারান। তাই ভাটার সময় সৈকতে গোসল করা পরিহার করুন। ভাটা ও জোয়ারের সময় অনুযায়ী সৈকতে লাল ও সবুজ পতাকা উত্তোলন করা হয়। যখন সবুজ পতাকা উত্তোলন করা হবে তখন গোসল করা নিরাপদ। গোসলের সময় বিচের বেশী গভীরে না যাওয়াই ভাল। প্রয়োজনে লাইফ জ্যাকেট সাথে রাখতে পারেন। ইনানি বিচে প্রবালের উপর হাটার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে নতুবা পা কেটে যেতে পারে। বিচের বালু বা পানিতে কোন প্রকার ময়লা আবর্জনা, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল, সিগারেটের ফিল্টার ইত্যাদি ফেলা থেকে বিরত থাকুন। এর সৌন্দর্য রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। যেহেতু সমুদ্র দেখতে যাচ্ছেন তাই যাবার পূর্বে আবহাওয়া সম্পর্কে তথ্য জেনে নিন।
দৃষ্টি আকর্ষণ: : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ তথা আমাদের দেশের সম্পদ। এসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, এবং অন্যদেরকেও এ বিষয়ে উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
.png)
