

মহেশখালী (Moheshkhali)
বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়িয়া দ্বীপ মহেশখালি (Moheshkhali Island)। এটি কক্সবাজার জেলার একটি উপজেলা যা কক্সবাজার শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার পশ্চিমে সাগরের মাঝে অবস্থিত। মহেশখালী উপজেলায় সোনাদিয়া, মাতারবাড়ি, ধলঘাটা নামে ৩টি দ্বীপ রয়েছে। পান, মাছ, শুঁটকী, চিংড়ি, লবণ এবং মুক্তার উৎপাদনে সমগ্র বাংলাদেশে এই উপজেলার সুনাম রয়েছে। কক্সবাজার থেকে ৪-৫ ঘন্টা সময় ব্যায় করলেই মহেশখালী দ্বীপ থেকে ঘুরে আসতে পারবেন।
কোথায় অবস্থিত
কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত ৩৬২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী(Maheshkhali )। এটি বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ । এর পশ্চিমে কুতুবদিয়া দ্বীপ ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে চকোরিয়া ও কক্সবাজার সদর উপজেলা, দক্ষিণে কক্সবাজার সদর ও বঙ্গোপসাগর এবং উত্তরে চকোরিয়া উপজেলা।
ঐতিহাসিকগণের মতে শিবের অপর নাম ‘মহেশ’ অনুসারে জায়গাটির নামকরণ। জনশ্রুতি আছে কোনো এক কালে এক কৃষক বনের ভেতরে একটি শিলা-বিগ্রহ খুঁজে পান। স্বপ্নযোগে তিনি জানতে পারেন যে, এটি ‘মহেশ’ নামের এক হিন্দু দেবতার বিগ্রহ। পরে তিনি একটি মন্দির নির্মাণ করে সেখানে বিগ্রহটি স্থাপন করেন। পর্তুগিজ পর্যটক সিজার ফ্রেডারিকের মতে ১৫৫৯ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে মূল ভূ-খণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মহেশখালী দ্বীপের সৃষ্টি। মহেশখালী চ্যানেল ও বাঁকখালী এখানকার উল্লেখযোগ্য নদী।
কি দেখবেন
মহেশখালি বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়িয়া দ্বীপ। মহেশখালী ১ নং জেটি ঘাট থেকে মহেশখালী বিখ্যাত মিস্টি পান মুখে দিয়ে অটোরিক্সা রিজার্ভ করে দুপাশে ম্যানগ্রোভ বন রেখে জেটি ধরে প্রথমেই চলে যান বড় বৌদ্ধ কেয়াং বা মন্দির।
বৌদ্ধ কেয়াং: মহেশখালী জেটি থেকে বাজারে প্রবেশের আগেই সড়কের বাঁ পাশে মহেশখালী বড় বৌদ্ধ কেয়াং বা মন্দির। এর ভেতরে আছে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির। বেশ কয়েকটি পিতলের বৌদ্ধ মূর্তির দেখা মিলবে এ কেয়াংয়ে। তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধ মূর্তি, মাথায় হাতে শায়িত বুদ্ধ এবং দণ্ডায়মান বুদ্ধ মূর্তি ইত্যাদি।
আদিনাথ মন্দির: মৈনাক পর্বতের উপরে রয়েছে আদিনাথ মন্দির। মন্দিরটির দৈর্ঘ্য ১০.৫০ মিটার, প্রস্থ ৯.৭৫ মিটার এবং উচ্চতা প্রায় ৬ মিটার। মন্দিরটির আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। উত্তরের অংশ সবচেয়ে পুরনো। আদিনাথ মন্দিরের পাশেই অষ্টভূজা নামে আরেকটি বিগ্রহের মূর্তি আছে। উত্তরের অংশের প্রথম ভাগে বর্গাকারের দুটি পূজাকক্ষে আদিনাথ বাণলিঙ্গ শিবমূর্তি এবং অষ্টভূজা দুর্গামূর্তি রয়েছে। সামনের দিকের প্রবেশপথটি ধনুকাকৃতির।
বহুকাল ধরে আদিনাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে চলে আসছে আদিনাথের মেলা। ধারণা করা হয় মন্দিরটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এ মেলার প্রচলন। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে অর্থাত্ শিব চতুর্দশী উপলক্ষে এ মেলার আয়োজন হয়।মন্দির থেকে নেমে পাশে আরেকটি জেটি ধরে সমুদ্রের কাছে চলে যেতে পারবেন। কেওড়া, গোলপাতাসহ সুন্দরী গাছের মনোরম দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। ছবি তোলার জন্যে পারফেক্ট জায়গা।
সেখান থেকে ফিরে আসার সময় লবণ চাষাবাদ করার জায়গা আর শুটকি পল্লীতেও ঘুরে আসবেন।
এখানে রয়েছে বেশ কিছু বোদ্ধ বিহার, জলাবন ও নানা প্রজাতির পশুপাখি। চাইলে ঝাউবাগান ও চরপাড়া বীচ থেকে ঘুরে আসতে পারেন। চলতি পথেই দেখতে পাবেন পান গাছের বাগান আর লবণের মাঠ। মহেশখালীর পানের সুনাম সারা বাংলাদেশ ব্যাপী তাই এখানে এলে অবশ্যই মনে করে পান খাবেন।
কিভাবে যাবেন
কক্সবাজার থেকে কাছে হওয়ায় পর্যটকরা সাধারণত কক্সবাজার এসে সেখান থেকেই মহেশখালী (Moheshkhali) দেখতে যায়। তাই সহজ উপায় হলো আপনাকে প্রথমেই কক্সবাজার চলে আসা।ঢাকা থেকে কক্সবাজার (Cox’s Bazar) বিভিন্ন উপায়ে আসা যায়।
কক্সবাজার যাওয়ার বিস্তারিত দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
মহেশখালীতে যাওয়ার জন্য পথ দুটি আছে। একটিতে আপনাকে প্রথমে কক্সবাজার আসতে হবে এবং এই পথটিই কক্সবাজারগামী পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক।
কক্সজবাজার শহরের যেকোন জায়গা থেকে মহেশখালী যাবার জেটিতে (৬ নং ঘাট) চলে আসুন। পারবেন। কলাতলী থেকে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় এবং টার্মিনাল থেকে ১৫০-২৫০ টাকায় ৬ নং ঘাটে যেতে পারবেন। মনে রাখবেন অটো, সিএনজি ও রিকশাগুলো ন্যায্য ভাড়া থেকে প্রায় দেড়-দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করে। তাই অবশ্যই দরকষাকযি করে ভাড়া ঠিক করবেন অন্যথায় বেশি টাকা গুনতে হবে।
৬ নং জেটি ঘাঁট থেকে স্পিডবোট বা ট্রলারে করে মহেশখালী দ্বীপে যাওয়া যায়। সিজনের সময় জেটি ঘাটে প্রচুর ভিড় থাকে তাই স্পিডবোট পেতে বেগ পেতে হয় যখন আপনি দলগতভাবে না হয়ে একাকি যাবেন বিশেষত তখন। তবে ১০-১২ জন একসাথে থাকলে স্পিডবোট রিজার্ভ করে খুব দ্রুতই চলে যাওয়া যায়। কিন্তু একাকী বা ২-৩ জন গেলে বোটের জন্য বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়।স্পিডবোটে করে দ্বীপে আসতে ১৫(+-)২ মিনিট লাগে। ট্রলারে ৩০ মিনিট লেগে যায়।
বোট বা ট্রলার থেকে নেমে ব্রিজ দেখতে পাবেন। ব্রিজের শুরুর মাথায় রিকশা/ইজিবাইক পাবেন। মহেশখালীর ৫ টা স্পট ঘুরিয়ে আনতে সিজনে তাই প্রচুর ভাড়া চাইতে পারে যেমন ৭৫০-১০০০ টাকা। ভুলেও এই ভাড়ায় যাবেন না। ৫০০ টাকার ভিতর নেওয়ার চেষ্টা করুন। যদি এই ভাড়ায় কেউ রাজি না হয় তবে ব্রিজ দিয়ে হেটে শেষ মাথায় চলে আসুন। এখানে এই ভাড়ায় অবশ্যই পেয়ে যাবেন।
আর অন্য পথে যেতে আপনাকে চট্টগ্রাম থেকে সড়ক পথে চকরিয়া এসে বদরখালি হয়ে মহেশখালি আসতে হবে। এ পথে মহেশখালি আসতে দেড় ঘন্টা সময় লাগে। চকরিয়া হয়ে যাবার পথে “মহেশখালী জেটি” চোঁখে পরবে।
কোথায় থাকবেন
অল্প দূরত্ব হওয়ায় মহেশখালী থেকে সহজেই ফিরে আসা যায়। এছাড়া মহেশখালীতে থাকার তেমন ব্যবস্থা নেই তাই রাত্রি যাপনের জন্য ফিরে আসুন কক্সবাজার। কক্সবাজারের খুব কাছে হওয়ায় কক্সবাজার হোটেলে থাকাই সবচেয়ে সুবিধাজনক।
কোথায় খাবেন
অল্প দূরত্ব হওয়ায় মহেশখালী থেকে সহজেই ফিরে আসা যায়। আর তাই সাময়িক ক্ষুদা নিবারণের জন্য দ্বীপেই হালকা খাবার খেয়ে নিতে পারেন। কিংবা ফিরে এসে খেতে পারেন কক্সবাজারে। কক্সবাজারে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। চাইলে এসব রেস্টুরেন্টের যেকোনো একটাতে খেয়ে নিতে পারেন। তাদের মধ্যে পৌষি, ধানসিঁড়ি, রোদেলা, ঝাউবন, নিরিবিলি ইত্যাদি উল্লেখ যোগ্য। সিজন অনুসারে এখানে খাবারের দাম কম বেশি হতে পারে। একটু দূরে হলেও পৌষিতে (প্রধান শহরে যেটা) একবার হলেও খাবেন। আশা করি অনেক ভাল লাগবে।
মহেশখালী ভ্রমণ টিপস
অফসিজন গেলে বা ছুটির দিন গুলো পরিহার করে ভ্রমণে গেলে খরচ কম হবে।
যাতায়াত বা খাওয়া দাওয়ার জন্যে সবকিছুতেই ভালো করে দরদাম করে নিবেন।
মহেশখালী ভ্রমণ করলে অবশ্যই এখানকার পান খেয়ে নেবেন।
মহেশখালী ভ্রমণ করলে অবশ্যই তার আশেপাশের পর্যটন কেন্দ্র গুলো জেনে যাওয়া ভালো।
সিজনে (ডিসেম্বর-মার্চ) সরকারি ছুটির দিন ব্যাতিত দিন গুলোতে গেলে আগে থেকে হোটেল বুক করার প্রয়োজন হবে না।
রিক্সাওয়ালা ও ইজিবাইক চলকরা দালাল হোটেল রুম ঠিক করে দেবার জন্যে বলতে পারে, তাদের পরিহার করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ: : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ তথা আমাদের দেশের সম্পদ। এসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, এবং অন্যদেরকেও এ বিষয়ে উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
.png)
